Breaking News
Home / সম্পাদকীয় / গ্যাসের চুলা ব্যবহারে সতর্কতা

গ্যাসের চুলা ব্যবহারে সতর্কতা

গ্যাস এখন নগরজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। গ্যাসের চুলায় রান্না নাগরিক জীবনে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। কিন্তু এই অতি দাহ্য বায়বীয় পদার্থটি ব্যবহারে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেন না। গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলোও দায়িত্বশীল নয়। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও ক্রমে বেড়ে চলেছে। বনানীর একটি আবাসিক ভবনে বৃহস্পতিবার গ্যাস থেকে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের যে ঘটনাটি ঘটেছে তা রোধ করা যেতো, যদি পূর্বসতর্কতা অবলম্বন করা হতো। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সে দিন রাতে ছয়তলা ভবনের চারতলায় গ্যাস লাইনের ফুটো থেকে সূত্রপাত হয়েছে অগ্নিকা-ের। আগুন লাগার পর বিস্ফোরণে ভবনটির কয়েকটি ফ্লোরের দেয়াল এবং জানালার কাচ ভেঙে গেছে। আগুনে দগ্ধ হয়েছেন এক ব্যক্তি। আহত হয়েছেন ১৯ জন। অভিযোগ আছে, রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির সময় গ্যাসলাইন ফুটো হয়ে যায়। গ্যাসের গন্ধ পাওয়ার পর গ্যাস কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও কোনো প্রতিকার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। আর গ্যাস কর্তৃপক্ষের এই অবহেলার পরিণামে ঘটেছে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা। সংগত কারণে এর দায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, দেশে প্রতিদিন যত দুর্ঘটনা ঘটে, সে সবের বেশির ভাগই অসাবধানতা ও গাফিলতির কারণেই ঘটে থাকে। যদি সাধারণ মানুষ সব ক্ষেত্রে সতর্ক-সচেতন থাকতেন, দায়িত্বশীল হতেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থা গুলো জনসচেতনতা তৈরিতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতো, তাহলে দুর্ঘটনার পরিমাণ প্রায়ই শূন্যের কোটায় চলে যেত। দুর্ঘটনা ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হতো অনেক কম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত পরিমাণে সচেতন ও দায়িত্বশীল নয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও সুচারুভাবে পালন করছে না অর্পিত দায়িত্ব। ফলে নানা দুর্ঘটনাও পিছু ছাড়ছে না। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও হচ্ছে পাহাড় সমান। অথচ আগেই সতর্ক পদক্ষেপ নেয়া হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। প্রসঙ্গত, কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসলাইন ফুটো হয়ে কিংবা গ্যাসের চুলা থেকে বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনা এবং হতাহতের খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে। ইদানিং নানা কারণে তা বেড়ে গেছে। আবাসিক ভবনে রান্নার চুলার গ্যাস বিস্ফোরণে হতাহতের বেশ কয়েকটি ঘটনার খবর খুব কাছাকাছি সময়ে দেশবাসী জানতে পেরেছে সংবাদমাধ্যমের বদৌলতে। গ্যাস সংযোগ ও চুলা বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে গত ১৪ মাসে শুধু রাজধানীতে নারী, শিশুসহ ২৫ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো দেড় শতাধিক মানুষ। বেসরকারি হিসাবে গত আট মাসে গ্যাসদুর্ঘটনায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মূল গ্যাসলাইন এবং বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগে ত্রুটি বা গ্যাসের চুলার ব্যবহারে অসাবধানতা ও অসচেতনতার পরিণামেই এসব দুর্ঘটনা হতাহতের ঘটনা ঘটছে। আবাসিক গ্যাস গ্রাহকদের মিটার না থাকার কারণে ও দুর্ঘটনার ব্যাপারে অসচেতনতার ফলে বিভিন্ন আবাসিক ভবনে দিনব্যাপী চুলা জালিয়ে রাখা হয়। এতে একদিকে গ্যাসের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। অনেক সময় পুরনো চুলার অফ-অন নবগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। অর্থাৎ চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করলেও গ্যাস লিকেজ হতে থকে। আবার যে সব এলাকায় সব সময় লাইনে গ্যাস থাকে না, সেখানে চুলা বন্ধ করার ব্যাপারে ব্যবহারকারীদের ঔদাসীন্য কাজ করে। অথচ এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কোনো বলিষ্ঠ উদ্যোগই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। গ্যাসের লাইনে ত্রুটি ও এ কারণে বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকা-ের ঘটনাও আমরা নিয়মিতই লক্ষ করে আসছি। ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ সংযোগের কারণেও ঘটছে অগ্নিকা-। পরিণামে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলেছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় ঝরে পড়ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। সম্পদ হানিও হচ্ছে হাজার কোটি টাকার। কিন্তু এ ব্যাপারে টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটলে কয়েকদিন হৈ চৈ ও প্রতিবিধান তৎপরতা দেখা গেলেও পরে সবই ঝিমিয়ে পড়ে। আবার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হলেও দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে দেখা যায় না। এখন সময় হয়েছে এসবের দিকে নজর দেওয়ার।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণসহ গ্যাসের আগুনে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আর এসব দুর্ঘটনার মূলে আছে কোনো না কোনো পর্যায়ে গাফিলতি ও অসচেতনতা। তাই গাফিলতি ও অসচেতনতা রোধে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। সাধারণত দুটি কারণে গ্যাসের চুলা থেকে অগ্নিকা- ঘটে। এর একটি হলো গ্যাসলাইনের ছিদ্র বা চুলার চাবি নষ্ট হয়ে যাওয়া। অন্যটি হচ্ছে গ্যাসের চুলা চালু করে অন্য কাজ করা বা এর ওপরে কাপড় শুকাতে দেওয়া। এসব বিষয়ে নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাসা বাড়িতে গ্যাস বিস্ফোরণ রোধ করতে হলে বাড়ির মালিক, বসবাসকারী, গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভূমিকা দরকার। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা যেমন নিতে হবে, তেমনি ব্যবহারের পর চুলা নিভিয়ে রাখা, চুলাকে সব সময় ত্রুটিমুক্ত রাখা, চুলা ব্যবহারের সময় জানালা খোলা রাখা, রান্নঘরে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা, গ্যাস লাইন বা নবে লিক বা কোনো ত্রুটি আছে কিনা তা রীতিমতো চেক করা এবং প্রতিবিধানে যুৎসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহ প্রভৃতি বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পদক্ষেপ নিতে হবে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত নির্বিশেষে প্রায় সব পরিবারই গ্যাসের চুলা ব্যবহার করে থাকে। এসব চুলা থেকে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই গ্যাসের চুলার ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো সম্পর্কে প্রতিটি পরিবারকে সতর্ক করতে হবে। গ্যাসের পাইপলাইনের কোথাও কোনো ত্রুটি আছে কিনা, তা সময়ে সময়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রান্নার কাজ শেষ হওয়ার পরও চুলার আগুন না নেভানোর মতো দায়িত্বহীনতার কারণে শুধু গ্যাসের অপচয়ই হয় না, দুর্ঘটনার আশংকাও তৈরি হয়। তাই রান্না শেষে আগুন নিভিয়ে ফেলার ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরির কর্মসূচিও থাকতে হবে। চসিক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া দরকার। মনে রাখতে হবে দুর্ঘটনা রোধে দায়িত্বশীলতা, জনসচেতনতা ও সাবধানতার বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতায় রোধ হতে পারে গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by