Home / সম্পাদকীয় / শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পর্যবেক্ষেণেই কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজন

শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পর্যবেক্ষেণেই কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজন

নজরুল ইসলাম তোফা:: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ইংরেজ আমল থেকে আরম্ভ করে আজঅবধি চলে আসছে। এই ব্যবস্থা আসলেই পুস্তক কেন্দ্রিকই বলা চলে। পাঠ্য বইয়ের কথা গুলো কোনও রকমে মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উদ্গীরণ করতে পারলে যেন, কৃতিত্বের সহিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অসুবিধাটি তাদের আসে না। সুতরাং এমন এ পরীক্ষায় জ্ঞানের পরীক্ষা না হলেও ‘স্মৃতি-শক্তির’ পরীক্ষায় পর্যবসিত হয়েছে। তাদের সুন্দর জীবন গঠনে পুঁথিগত বিদ্যার কিছুটা প্রয়োজন আছেও বৈকি। এইকথা অস্বীকার করবার উপায় নেই। কিন্তু, পুঁথিগত শিক্ষা মানুষকে জীবনের সমস্যা সমাধান করে না। জার্মানির বোখুম শহরের একটি স্কুলে পড়াশোনা বিষয়টি একবারেই নতুন পদ্ধতিতে কিংবা খেলাধুলার ছলে শেখান হয়৷ সেখানে প্রোমোশন ও ভালো রেজাল্ট বড় কথা নয়৷ ছোট ছেলে-মেয়েরা কারিগরি ক্লাসে তরোয়াল তৈরি করতেই শেখে৷ আসলেই তারা খেলার ছলেই শেখে বিভিন্ন কায়দাকানুন৷ তাছাড়াও প্রতিটি শিশুর কাজ করার ধরনও আলাদা৷ সুতরাং শিশুরাই যেন প্রস্তাব দেয়, তারা কী করতে চায় বা না চায়৷ শিশুর ইচ্ছেটা প্রতি এখানে পুরোপুরি দাম দেয়া হয়। শিক্ষালাভের ক্ষেত্র সঙ্কীর্ণ নয়- বলা যায় ‘বিস্তৃত’। বিদ্যালয়ে লেখা পড়া ছাড়াও যে সমস্ত কাজ গুলো বিদ্যালয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, সেই গুলোকে আপাত-দৃষ্টিতে অর্থহীন বলে মনে হলেও যেন প্রকৃত পক্ষে তা- নয়। যেমন, বাগান করা, পিকনিক করা, না…সুস্থ কিংবা সবল জাতি গঠনেই খেলা ধুলার কোনো বিকল্প নেই। শিশুর পাঠাভ্যাসে একঘেয়েমির জন্যে স্কুলমূখী হতে চায় না। আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমেই পাঠদান করানো দরকার। রবীন্দ্রনাথ বলেছে তাহল ”বাল্যকাল হইতেই আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নেই, কেবল যাহা কিছু নিতান্ত আবশ্যক, তা কন্ঠস্হ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনমতে কাজ চলে মাত্র কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না। সঠিক শিক্ষা না হলেই যে পারিবারিক, সামাজিক- দ্বায়িত্ব পালনে তারা তেমন কোনও সহায়তাই করে না। সুতরাং জীবনের বৃহত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে- যে গুণাবলির প্রয়োজন, সেই গুলো পুঁথিগত শিক্ষা থেকেই আহরণ করা যায় না। জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়েই যে শক্তি অর্জিত হয়, সে শক্তি অর্জনটাই যেন- শিক্ষার উদ্দেশ্য। শিশুদের জন্মগ্রহণ করালেই সে শিশু প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। শিশু সন্তানকে যথার্থ মানুষের মতো মানুষ করে তোলার জন্যে সাধনার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হয়। কোমলমতী শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। শৈশবের সময়টাই প্রাণোচ্ছলতা কিংবা আরামের মুহূর্ত। সেই দিকটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে লালন-পালন করতে হবে। সন্তানরা তো কখনো সখনো ‘ক্লান্ত-শ্রান্ত’ হয়েই ঘুমে ঢুলুঢুলু বা অস্থির কিংবা চঞ্চল হয়। ঠিক তখন শিশুকে পাঠাভ্যাসে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণটা হলো তখন এসব শিক্ষা মনে বসবে না। এমনকি সে এসম্পর্কে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও দেখাতেও পারে। তাই শিশুদের গল্প শুনাতে হবে। শিশুদের বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের গল্প, গাছপালা নিয়ে গল্প, রূপকথার গল্প, সহজ পৌরাণিক গল্প, মজার গল্প, জিন- পরীর গল্প এবং জন্তু-জানোয়ারের গল্পগুলি ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে শেষ করা প্রয়োজন। কাল্পনিক গল্পই শিশুরা অনেক ভালবাসে কারণ তারা কল্পনা প্রবণ।
সৃজনশীলতা বাড়াতেই পাঠ্য পুস্তকের পড়া-শোনার পাশাপাশি কল্পনা ও কর্মমুখী বিষয়গুলোতেই জোর তাগিদ দেয়া আবশ্যক।

পড়াশোনাকে প্রাণবন্ত এবং উপভোগ্য করবার জন্য মাঝে মধ্যে তাদেরকে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন রয়েছে বৈকি। মানসিক গঠনের জন্যে যে “মূল-মন্ত্র” আছে, তাকে পরিপূর্ণতা দিতে শিশু, কিশোর কিংবা শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষা-মূলক মজার মজার সহজ পুস্তক তুলে দেয়া দরকার। প্রযুক্তি গত ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি, তাদেরকে এনে দিতেই পারে- সৃজনশীলতা, মননশীলসম্পন্ন অনেক আবেগ। তাদের পাঠ চর্চায় কঠোরতার কারণে- শিশুদের মানবিকতা, মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্য প্রীতি যেন বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সন্তানরা দিনে দিনেই মাদকতা, সন্ত্রাস, নেশা, দুর্নীতি সহ খুন নিয়েই কোনো না কোনো ভাবেই বড় হবে। এ সকল সংঘটিত হচ্ছে উঠতি বয়সী কোমলমতি সন্তানদের মাধ্যমেই। ফলে, যোগ্য হিসেবে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতেও পারছে না। এমন নানা ভাবনা চিন্তাবিদরা হরহামেশা পরামর্শ দিয়ে থাকে। এথেকে পরিত্রাণের উৎকৃষ্ট উপায়টি হচ্ছে বিনোদন মূলক বই পড়ানোর অভ্যাস সৃষ্টি করা। বই পাঠে তাদের আনন্দ আসবে, মানসিক পরিবর্তন ঘটবে এবং সন্তানের উন্নত ধ্যান ধারণাও জন্মাবে। ফলত তারাই আপন জগতকেও চিনবে। অপরাধবোধ, অপচিন্তা দূর হবে। দেশ-প্রেম, জাতি-প্রেম, আপনাতেই জেগে উঠবে। আর তখনই উন্নত-সমৃদ্ধর ‘জাতি’ তৈরির পাশাপাশিও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে। শিশুর শিক্ষার প্রধান কথা শেষ নিরিখে বলা যায় আগ্রহ সৃষ্টি। তাই ভালো লাগা, মন্দ লাগা এবং রুচিশীলতা বৃদ্ধি করার সঙ্গে বুদ্ধির প্রবণতাকেই কর্মমুখী শিক্ষায় জীবন গড়ানো প্রয়োজন। কর্মমুখী শিক্ষার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবেই সরকারি উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ একটি সুনামধন্য অতিশয় গুনান্বিত নাগরিক জাতি পাবে।
লেখক:
নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

Check Also

ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অবস্থা এবং————

পড়াশোনাই ছাত্রের একমাত্র তপস্যা হওয়ার কথা। কিন্তু, সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছাত্ররা শুধু বিদ্যার্জন করবে তা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by